কক্সবাজার সদরের দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী মো. রিয়াজুদ্দিনের এগিয়ে চলা ও সফলতার গল্প

গল্পের শুরু:

২০২০ এর মধ্য মার্চের কথা। এক দুপুরে কক্সবাজার সদর উপজেলার বাংলাবাজারে একজন তরুনকে দেখে একটু কৌতুহল হলো। সিএনজিতে করে তিনি কয়েকটি দোকানে কাপ দৈ সরবরাহ করছিলেন। দৈ আমার নিজেরও পছন্দের খাবার। তাই তার সাথে কথা বলার  আগ্রহ বোধ করলাম এভাবে বাংলাবাজারের একজন দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী এবং উদ্যোক্তা মো. রিয়াজুদ্দিন এর সাথে পরিচয় এর শুরুর দিকের কথা বলছিলেন এসিডিআই/ভোকা’র ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর তড়িৎ কুমার রায়।

কক্সবাজার জেলার সদর উপজেলার পিএম খালি ইউনিয়নের কাঁঠালিয়া মোড়া  গ্রামের জনাব   আব্দুল গফফার এবং সালেহা বেগম দম্পতির ৫ সন্তানের মধ্যে ৩য় সন্তান মো. রিয়াজুদ্দিন। শিক্ষাগত জীবনে মাত্র ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত অধ্যয়নের সুযোগ হয়েছিল তার। বাড়ীতে অভাবের সাথে ছিল নিত্য বোঝাপড়া। অভাবের তাড়নায় এক পর্যায়ে লেখাপড়ার ইতি টেনে তিনি কাজ নেন কক্সবাজার সদরের চৌরঙ্গী হোটেলে। সেখানে তার বেতন ছিল মাত্র ১২০০ টাকা। বয়স সবেমাত্র ১৪ বছর। আরো অর্থ উপার্জনের আশায় তিনি চলে যান চট্টগ্রামে। মিষ্টি বানানোর কারিগরদের সহযোগী হিসেবে কাজ শুরু করেন ‘স্বাদ’ এ। মাসিক বেতন ছিল ৫০০০ টাকার মতো।

মিষ্টির কারখানায় জীবন:

স্বাদ’ এ রিয়াজুদ্দিনের কাজ ছিল কারিগরদের মিষ্টি বানানোতে সহযোগিতা করা।এ কাজ করার সময় শিখেছেন কিভাবে নানারকমের মিষ্টি বানাতে হয়। সেখানে কাজ করেছেন ২ বছর। এসময় তিনি গ্রামে আসেননি। এরপর ২ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে যোগ দেন ফুলকলি’তে। সেখানেও তার কাজ ছিল সহযোগীর। তিনি মিষ্টি বানানোর কারিগরদের কাজে সহযোগিতা করতেন। এখানে নানা ধরনের দৈ, মিষ্টি বানানোতে নিজেকে আরো দক্ষ করে তোলেন।

ফুলকলিতে তিনি ৩ বছর কাজ করেছেন। এভাবে কাজ করতে করতে তিনি স্বপ্ন দেখতে থাকলেন, নিজে থেকে কিছু শুরু করার। বাবা-মা’কে দুধ থেকে দৈ বানানোর আগ্রহের কথা জানালেন। এভাবে ৫ বছরের অভিজ্ঞতাকে, নিজের উপর বিশ^াস আর বাবা-মা’র আর্শীবাদকে সঙ্গী করে ২০১৮ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারী মাত্র ৫০০০ টাকা নিয়ে কক্সবাজার সদর উপজেলার বাংলাবাজার এলাকায় শুরু করেন দুধ থেকে দৈ বানানোর কাজ। প্রথমদিন তিনি জুমছড়ি এলাকার ফিরোজ সাহেবের খামার থেকে কেনা ২০ লিটার দুধ থেকে ১৫০ কাপ দৈ বানিয়ে শুরু করেছিলেন।

গাভী পালন পুষ্টি উন্নয়ণ প্রকল্পের সাথে সংযুক্তি:

২০১৯ সালের মার্চ থেকে আমেরিকান দাতাসংস্থা ইউএসএআইডি’র ফিড দ্যা ফিউচার কার্যক্রমের আওতায় এসিডিআই/ভোকা কক্সবাজার এলাকায় লাইভস্টক প্রোডাকশন ফর ইম্প্রুভড নিউট্রিশন এক্টিভিটি শুরু করে। এ প্রকল্পের আওতায় গ্রামীন এলাকার দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারীদের নানাভাবে সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কাজ করা হয়। ইতিপূর্বে দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী মো. রিয়াজুদ্দিন মসজিদের ইমামের কাছ থেকে নিয়মিত দুধ ও মাংস সেবনের উপকারিতা বিষয়ে জানতে পারেন। ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে ধীরে ধীরে রিয়াজুদ্দিন এর ব্যবসা উদ্যোগের সাথে পরিচিত হতে থাকেন লাইভস্টক প্রোডাকশন ফর ইম্প্রুভড নিউট্রিশন এক্টিভিটি’র ফিল্ড ফ্যাসিলিটেটর তড়িৎ কুমার রায় এবং তিনি রিয়াজুদ্দিনের এর ব্যবসায়িক সম্ভাবনা দেখতে থাকেন। এসময় তিনি বুঝতে পারেন রিয়াজুদ্দিনের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে পণ্যের গুনগত মানের উন্নয়ন একটি প্রধান বাঁধা। এর কিছু সময় পর দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনার প্রকোপ ঠেকাতে শুরু হয় লকডাউন কর্মসূচী। সেসময়, ইউএসআইডি’র আর্থিক সহযোগিতায় বাস্তবায়িত লাইভস্টক প্রোডাকশন ফর ইম্প্রুভড নিউট্রিশন এক্টিভিটি’র আওতায় কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন উপজেলায় নির্বাচিত  ক্ষুদ্র দুগ্ধ উদ্যোক্তাদের স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে দুধ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরন ও বিপণনের উপর ভার্চুয়াল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে এসিডিআই/ভোকা। এ প্রশিক্ষনে কক্সবাজার সদর উপজেলার পিএম খালী ইউনিয়ন থেকে যুক্ত হন মো. রিয়াজুদ্দিন। প্রশিক্ষন থেকে প্রাপ্ত জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে করোনাকালীন সময়ের মধ্যেও পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজস্ব কারখানায় দুধ থেকে মানসম্মত দৈ তৈরী এবং বিপণন অব্যাহত রাখেন তিনি। এর ফলে তার তৈরী দৈ এর গুনগত মান এবং স্বাদে লক্ষ্যনীয় পরিবর্তন আসে এবং বাজার জাত করনে তিনি সফল হন যা তার বিক্রি বাড়াতে সহায়ক হয়ে উঠে।

বর্তমান কর্মব্যস্ততা:

সরেজমিনে ২০২১ সালের মার্চ মাসে এ প্রতিবেদকের আবার যাওয়ার সুযোগ হয় রিয়াজুদ্দিনের দৈ তৈরীর কারখানায়। সেখানে ঘুরে দেখি তার বর্তমান কর্মকান্ড। নিজ আগ্রহ আর পরিশ্রম থেকে রিয়াজুদ্দিন বর্তমানে তার কারখানার উৎপাদন বাড়িয়েছেন। বর্তমানে প্রতিদিন ৭০-৮০ লিটার দুধ তার কারখানায় দৈ তৈরীতে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিদিন গড়ে ৫০ টি দোকানে তিনি প্রায় ৬০০ কাপ মিষ্টি দৈ সরবরাহ করেন। মিষ্টি কারখানায় কাজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বিভিন্ন সামাজিক রসমালাই, পায়েস, ফিরনি, নানা পদের মিষ্টি তৈরীর ফরমায়েশ ও নিয়ে থাকেন। তাকে জিজ্ঞেস করা হলে, তিনি বলেন, গাভী পালন ও পুষ্টি উন্নয়ণ প্রকল্প থেকে পাওয়া প্রশিক্ষণ কাজে লাগিয়ে তিনি বর্তমানে স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য উৎপাদন এবং বিপণনের কৌশল  আয়ত্ত করেছেন যা ভোক্তাদের চাহিদাকে সন্তুষ্ট করছে। সবখরচ বাদ দিয়েও বর্তমানে তার মাসিক ৩০,০০০-৩৫,০০০ টাকা আয় হচ্ছে।  তিনি স্বাবলম্বি হয়ে পরিবারেও খরচের যোগান দিচ্ছেন। সম্প্রতি তার আয় থেকে বড় ভাইকে বিয়ে করিয়েছেন, বড় বোনের বিয়ে দিয়েছেন। নিজের লেখাপড়াকে বেশীদূর এগিয়ে যেতে না পারলেও ছোট ভাইকে তিনি শিক্ষিত ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে চান। বর্তমানে তার কারখানায় ছোট ভাই এবং বাবা সহযোগিতা করেন। রিয়াজুদ্দিন স্বপ্ন দেখেন একদিন তার কারখানার কলেবর আরো বৃদ্ধি পাবে। শহরের ব্যস্ততম এলাকায় তার শোরুম থাকবে- যেখানে মানসম্মত নানারকমের মিষ্টি এবং দুগ্ধজাত দ্রব্য বিক্রয় করা হবে। তিনি ভোক্তাদের মানসম্মত দুগ্ধ পণ্য আরো বেশী করে সরবরাহ করতে চান। তিনি চান প্রান্তিক পর্যায়ের শ্রমজীবি মানুষরাও যেন সুলভে দুগ্ধজাত পণ্য খেতে পারেন।

ভবিষ্যত পরিকল্পনা:

ভবিষ্যত পরিকল্পনা হিসেবে রিয়াজুদ্দিন বিএসটিআই এর অনুমোদন নিয়ে দৈ প্রক্রিয়াজাতকরনের পাশাপাশি দুধ থেকে পনির তৈরী এবং বিপনণের মাধ্যমে ব্যবসা সম্প্রসারনে আগ্রহী ।

রিয়াজুদ্দিন এর সফলতার পেছনে কাজ করেছে জেদ, অধ্যবসায় আর সফল হবার দুরন্ত আশা। তাছাড়া, মা-বাবার আর্শীবাদকে পাথেয় করে রিয়াজুদ্দিন এর এই এগিয়ে চলা, তার বর্তমান কর্মব্যস্ততা, মানুষের পুষ্টি উন্নয়নে তার কাজ, করোনাকালীন সময়েও আমাদের আশাবাদি করে।

নিজস্ব কারখানার সামনে প্রস্তুতকৃত দৈ এর কাপ হাতে রিয়াজুদ্দিন